সড়ক দুর্ঘটনা কি নিছক দুর্ঘটনা?

ড. মুহ. আব্দুর রহীম খান

ও তাসনীম ইসলাম দ্যুতি

বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা মহামারি আকার ধারণ করেছে। সড়ক দুর্ঘটনার কারণগুলো বহুবার চিহ্নিত করা হলেও এসবের কোনোটির ক্ষেত্রে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। শুধু এবারের ঈদ যাত্রায় (ঈদের আগের সাত দিন, ঈদের দিন ও ঈদের পরের সাত দিন) ৪৩৮ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। ২০২৩ ও ২০২৪ সালের জানুয়ারি-মার্চ সময়ের তুলনামূলক পরিসংখ্যান নিম্নরূপ :২০২৩ সালের জানুয়ারি-মার্চে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ১০১৭টি, তাতে মৃত্যু হয়েছে ১০৫১ জনের, আহত হয়েছেন ১ হাজার ৪৪০ জন। অন্যদিকে এক বছর পর ২০২৪ সালে ঐ একই সময়ে, অর্থাত্ জানুয়ারি-মার্চে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ১ হাজার ৬৩০টি, তাতে মৃত্যু হয়েছে ১ হাজার ৪৭৭ জনের, আহত হয়েছেন ১ হাজার ৯২০ জন। এই এক বছরে সড়ক দুর্ঘটনা বৃদ্ধি ঘটেছে ৬০.২৮ শতাংশ, নিহত ও আহতের সংখ্যা বেড়েছে যথাক্রমে ৪০.৩৩ শতাংশ ও ৩৩.৩৩ শতাংশ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি) যৌথভাবে ২০১৬ সালে একটি জরিপ করেছিল। এই জরিপে দেখানো হয়, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় বছরে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ মানুষ আহত হয়। পাশাপাশি প্রায় ৮ হাজার মানুষ প্রতিবন্ধী হয়ে পড়ে। এদের মধ্যে ১২ হাজারের বেশি ১৭ বছরের কম বয়সি শিশু। সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের ২০১৭ সালে প্রকাশ করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, সড়ক দুর্ঘটনায় একজন কর্মক্ষম ব্যক্তির প্রাণ হারানোর কারণে ২৪ লাখ ৬২ হাজার ১০৬ টাকার ক্ষতি হয়। তবে এর সঙ্গে দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তির পরিবারের অন্যদের অর্থনৈতিক চাপ, কর্মক্ষেত্রের ক্ষতিসহ অন্যান্য বিষয় আমলে নেওয়া হয়নি। গত ১৭ এপ্রিল ২০২৪ রোড সেফটি ফাউন্ডেশন গত ঈদ যাত্রায় মানবসম্পদের ক্ষতির একটা হিসাব উপস্থাপন করেছে। এই হিসাবে দেখা যায়, প্রতিদিন ২২০ জন প্রতিবন্ধী হচ্ছে সড়ক দুর্ঘটনায়।

সেখানে দেখা যায় যে এর আর্থিক মূল্য ১ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা। অর্থনীতিবিদগণের হিসাবে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ও আহত এই মানুষগুলো জিডিপিতে ন্যূনতম ২ থেকে ৩ শতাংশ অবদান রাখত, যা থেকে বাংলাদেশ বঞ্চিত হচ্ছে। সড়ক দুর্ঘটনা  প্রতিরোধে এবং দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর জানমালের নিরাপত্তাবিধানে রাষ্ট্রের পক্ষে কাজ করে মূলত চারটি সংস্থা। যথা :বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), রেঞ্জ পুলিশ, ট্রাফিক পুলিশ ও হাইওয়ে পুলিশ। ইতিমধ্যে সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ প্রণীত হয়েছে। বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের দায়-দায়িত্বও ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। উপরন্তু, বাংলাদেশ পেনাল কোড ১৮৬০ থেকে শুরু করে মোটরযান অধ্যাদেশ ১৯৮৩, সড়ক চলাচল আইন ১৯৮৮সহ অর্ধশতাধিক নীতি, আইন, অধ্যাদেশ, প্রবিধান ও বিধান রয়েছে এসংক্রান্ত। এই সবকিছু ছাড়িয়ে সবার ওপরে আসীন আছে জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা পরিষদ। বিআরটিএর সঙ্গে সংযুক্ত সড়ক নিরাপত্তা সেল এবং প্রতিটি জেলায় রয়েছে জেলা পর্যায়ের সড়ক নিরাপত্তা কমিটি। গবেষণায় দেখা যায়, সরকারি যেসব সংস্থা যেমন বিআরটিএ এবং ট্রাফিক ও হাইওয়ে পুলিশ সরাসরি এক্ষেত্রে নিয়োজিত। তারা তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনে সক্ষম হচ্ছে না। বিআরটিএর ভূমিকা মূলত রেগুলেশনধর্মী। যে মোটরযানগুলো সড়ক-মহাসড়কে চলাচল করে সেগুলোর ফিটনেস আছে কি না, তা পরীক্ষা করে সনদপত্র প্রদান করা। বাস্তবতা হলো দুর্নীতি, অদক্ষতা এবং উপযুক্ত জনবলের অভাবে বিআরটিএ কাজটি করতে পারছে না। ২০১৮ সালের একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, প্রায় ৫০ লাখ মোটরযান রাস্তায় চলাচল করছে, তাদের মধ্যে মাত্র ৩১ লাখ রেজিস্ট্রিকৃত। যে মোটরযানের নিবন্ধনই হয়নি, সেই মোটরযানের ফিটনেস গ্রহণের কোনো প্রয়োজন পড়ে না। অন্যদিকে মোটরযান চালকের যোগ্যতা ও উপযুক্ততা সাপেক্ষে লাইসেন্স প্রদান করাও বিআরটিএর আইনি দায়িত্ব। বিভিন্ন উত্স থেকে দেখা যায়, প্রায় ৭০ লাখ মোটরযান (ভারী, হালকা, পিকআপ ভ্যান, সিএনজি অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক, নসিমন, করিমন ইত্যাদি) চালক বাংলাদেশের সড়ক-মহাসড়কে নিয়োজিত আছে। ৫৪ লাখ গাড়িচালকের কোনো বৈধ লাইসেন্স নেই। মাত্র ১৬ লাখ গাড়িচালকের রয়েছে বৈধ লাইসেন্স। এদের মধ্যে মাত্র ২ শতাংশ সরকারিভাবে স্বীকৃত প্রশিক্ষণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান দ্বারা প্রশিক্ষিত। অবশিষ্ট ৯৮ জনই শিক্ষানবিশ। এরা শুরু করে একজন ওস্তাদ গাড়িচালকের কাছে, যার নিজেরই কোনো আনুষ্ঠানিক বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নেই। ‘রুট পারমিট’ ইস্যু করার বিষয়টিও এক্ষেত্রে চলে আসে। রাজনৈতিক আশ্রয়ে পরিপুষ্ট, অর্থ ও পেশিশক্তির অনুগত হয়ে রুট পারমিটগুলো ইস্যু করা হয়ে থাকে।

ট্রাফিক পুলিশ ও হাইওয়ে পুলিশের স্থায়ী নির্দিষ্ট কোনো জনবল নেই। অন্যান্য ইউনিট থেকে বদলি করে সাময়িকভাবে কিছুদিনের জন্য ট্রাফিক ও হাইওয়ে পুলিশের অধীনে পদায়ন করা হয়। একজন উপ-পুলিশ মহাপরিদর্শকের নেতৃত্বে চারটি প্রধান অঞ্চল যথা—গাজীপুর, কুমিল্লা, বগুড়া ও মাদারীপুরে হাইওয়ে পুলিশের কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে। এটি আবার ৯টি জোনে বিভক্ত। ৯টি জোনের অধীনে পরিচালিত হয় ১৮টি পুলিশ স্টেশন এবং ৪৪টি আউটপোস্ট। ২০২৩ সালের হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশ এখন সড়ক ও মহাসড়কের ব্যাপ্তি ৩ লাখ ৭৫ হাজার কিলোমিটার। এই যে বিশাল সড়ক ও মহাসড়ক জালের মতো ছড়িয়ে আছে, তার তদারকি হাইওয়ে পুলিশের বর্তমান যে জনবল ও সাংগঠনিক কাঠামো, তা দিয়ে কি আদৌ সম্ভব? ট্রাফিক পুলিশের মধ্যে কেবল কনস্টেবল, সহকারী ও উপপরিদর্শক/সার্জেন্ট—এরা মাত্র ৪২ দিনের গাড়ি চলাচল তথা  ট্রাফিক বিষয়ে পেশাগত প্রশিক্ষণ লাভ করে থাকেন। কিন্তু তাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ যথা—সহকারী কমিশনার, সুপারিন্টেন্ডেড অব পুলিশ কিংবা ডিআইজিগণ কোনো রকম প্রশিক্ষণ ছাড়াই ট্রাফিক ইউনিটে পদায়িত হতে পারেন। বিলাসবহুল বাসের চালক ছাড়া অন্যান্য গাড়িচালক যে জীবন যাপন করেন, তা স্বাভাবিক নয়। প্রয়োজনীয় বিশ্রাম, নিয়োগপত্র কিংবা নির্দিষ্ট বেতনভাতা ছাড়াই মালিকের অভিপ্রায় অনুযায়ী তারা পেশাগত কর্মকাণ্ড চালিয়ে যান।

সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতি বছর সহস্রাধিক মানুষ নিহত এবং এর দ্বিগুণ আহত হলেও এটি নিয়ন্ত্রণের জন্য হাইওয়ে পুলিশের জনবল রয়েছে মাত্র ২১৯২ জন। এসডিজি টার্গেট ৩.৬-এ নির্ধারিত ছিল যে, ২০২০ সালের মধ্যে সারা বিশ্বের দেশগুলো তাদের সড়ক দুর্ঘটনার হার অর্ধেক, অর্থাত্ ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনবে। কিন্তু বাস্তবে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের হার অনেকটা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। গলদ কিংবা গাফিলতিটা কোথায়, তা অবশ্যই খুঁজে বের করে তার বাস্তবায়নযোগ্য সমাধান আমাদের দিতে হবে। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, ইংরেজি ‘E’ অক্ষরের চারটি শব্দ ‘Education, Environment, Engineering and Enforcement’ বিষয়ের ওপর যথাযথ গুরুত্ব না দেওয়া হলে সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাস করা সম্ভব হয়ে উঠবে না। মানুষসৃষ্ট সড়ক দুর্ঘটনার মতো মহামারি থেকে রক্ষা পেতে হলে সংশ্লিষ্ট সবাইকে কালবিলম্ব না করে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

n লেখকদ্বয় :যথাক্রমে সহযোগী অধ্যাপক এবং গবেষণা সহযোগী, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট (বিআইজিএম)