ইত্তেফাকের কালিতে হলুদের ছোঁয়া পড়েনি

 

মোহাম্মদ শাহজমান শুভ

আ মার জন্ম ১৯৮০ সালে আর দৈনিক ইত্তেফাকের জন্ম ১৯৫৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর। আমি দিন দিন বুড়ো হচ্ছি আর দৈনিক ইত্তেফাকের যৌবন বাড়ছে। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়াকালীন দৈনিক ইত্তেফাকের কমিক্্স পড়তাম। এরপর পর্যায়ক্রমের খবর, বিজ্ঞাপন, ফিচারের স্বাদ পাই। এখনো দৈনিক ইত্তেফাক পড়ি।

দৈনিক ইত্তেফাক এক অর্থে বাংলাদেশের মুখপত্র। দলমত নির্বিশেষে বাংলাদেশের কথা বলে। এর কালিতে হলুদের ছোঁয়া পড়েনি। সেজন্যেই আবহমান বাংলাতে সত্তর বছর ধরে টিকে আছে। ইত্তেফাক নিয়ে আমার চাকরিজীবনের একটি বিশেষ অভিজ্ঞতা আছে। গ্রাজুয়েশনের পর প্রথম চাকরির ইন্টারভিউয়ের মুখোমুখি হলাম। শুধু পত্রিকা সম্পর্কেই আমাকে দশ-পনেরো মিনিট প্রশ্ন করা হলো। প্রথম প্রশ্নটি ছিল আপনার প্রিয় পত্রিকা কোনটি? আমি উত্তর দিয়াল, দৈনিক ইত্তেফাক। এরপর আমাকে প্রশ্ন করলেন যুগান্তর পড়েন?

—জি পড়ি।

—ইনকিলাব পড়েন?

—জি, পড়ি।

—জনকণ্ঠ পড়েন?

—জি পড়ি।

এই ধরনের অনেক প্রশ্ন করলেন। আমার কাছ থেকে ভালো লাগা আর না লাগার পত্রিকার আর কোনো তথ্য না পেয়ে প্রশ্নকর্তারা বিরক্তি প্রকাশ করলেন। তারপরে বললেন, দৈনিক ইত্তেফাক আপনার কেন ভালো লাগে? আমার ভালো লাগার কারণ এটি বাংলাদেশের একটি প্রসিদ্ধ বাংলা সংবাদপত্র। এটি জনগণের জন্য দেশের ও বিশ্বের বড় ঘটনা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, খেলাধুলা, শিক্ষা, আবহাওয়া, সংস্কৃতি ইত্যাদি সম্পর্কে বস্তুনিষ্ঠ তথ্য প্রদান করে। ইত্তেফাক বাংলাভাষায় লেখা, এবং তার সাংবাদিক স্টাইল পাঠকদের সহজে বুঝতে সাহায্য করে। দৈনিক ইত্তেফাক বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং এর ইতিহাস, ভূমিকা এবং প্রতিষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য ভালোভাবে প্রকাশ করে। স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত এটি বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের কথা বলে চলেছে।

ইন্টারভিউয়ের পর শর্ত থাকায় আমি ঐ চাকরিটি পাইনি, তবে এখনো এই ইন্টারভিউয়ের কথা মনে পড়ে। আমি মালয়েশিয়া থাকা অবস্থায় সপ্তাহে একদিন রবিবার ইত্তেফাক পত্রিকা পড়তাম। তখন অনলাইনে পড়ার এতোটা সুযোগ পেতাম না। এখন অবশ্য ইত্তেফাকের অনলাইন সংস্করণও উন্নত। মালয়েশিয়ার কোতরায় বাংলাদেশি পত্রিকা পাওয়া যেত। বিদেশের মাটিতে বাংলার মানচিত্র খুঁজে পেতাম এই ইত্তেফাক পত্রিকায়। সে এক দারুণ অনুভূতি।

 

t লেখক : শিক্ষক, তিতাস, কুমিল্লা

 

সময়ের স্বপ্নসারথি

 

আবদুর রহমান জামী

দৈ নিক ইত্তেফাক শুধু নাম নয়, কালের সারথি, সকল পাঠকের স্বাপ্নিক ধারক। জেপি সভাপতি প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ আনোয়ার হোসেন মঞ্জু দীর্ঘদিন এই পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। এখন তাসমিমা হোসেন এই ঐতিহ্যবাহী পত্রিকার আলোকশিখার বাহক। এই দৈনিকের প্রতিষ্ঠাতা তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া ছিলেন আধুনিক সাংবাদিকতার দিকপাল, প্রগতিশীল সাংবাদিকতার একটি বাতিঘর।

ইত্তেফাক কারো লেজুড়বৃত্তির সংকীর্ণ ঘেরাটোপে আবদ্ধ নয়। আধুনিক সাংবাদিকতার জন্য অনুকরণীয় একটি গণমাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে দৈনিক ইত্তেফাক। বিশ্ব প্রবাহ, অর্থনীতি, কড়চা, ক্যাম্পাস, কচি-কাঁচার আসর, ইসলামী চিন্তা, সাপ্তাহিক সাময়িকীসহ বিভিন্ন ফিচার দৈনিক ইত্তেফাককে একটি সমৃদ্ধ পত্রিকায় পরিপূর্ণতা দিয়েছে। এই পত্রিকার সম্পাদকীয় ও মতামত পাতা অন্যসব পত্রিকা থেকে ভিন্ন চরিত্রের, অভিনব, অনন্যসাধারণ। তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার জিয়নকাঠির স্পর্শে ইত্তেফাক আজ অবধি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে কেন্দ্রীভূত করে একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ তৈরির প্রচেষ্টায় অংশীদার হয়ে এগিয়ে চলছে। এই চলার কোনো বিরাম নেই।

 

t লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

 

একাত্তর আর ইত্তেফাক

একসূত্রে গাঁথা

 

রিয়াদ হোসেন

দৈ নিক ইত্তেফাক এ প্রজন্মের কাছে একটি সংবাদপত্র হিসেবে পরিচিতি পেলেও ইত্তেফাক আর স্বাধীন বাংলাদেশের গল্প একই সূত্রে গাঁথা। এ দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য, ভাষা আর সংস্কৃতির সঙ্গে দৈনিক ইত্তেফাকের যোগসূত্র সেই জন্মলগ্ন থেকে। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ৬৬-র ছয় দফা দাবি, ৬৯-এর অসহযোগ আন্দোলন, ৭০-এর নির্বাচন এবং সবশেষ ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে দৈনিক ইত্তেফাকের অবদান ছিল অনস্বীকার্য। বিশেষ করে, ১৯৬৬ সালে যখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তার ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবি উত্থাপন করেন তখন দৈনিক ইত্তেফাক তার পক্ষে ব্যাপকভাবে প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে জনমত গড়ে তোলে। পরবর্তীকালে যা মহান মুক্তিযুদ্ধে দেশমাতৃকার অকুতোভয় সন্তানদের আত্মত্যাগে উদ্বুদ্ধ করে। যে কারণে ইত্তেফাক এক অনন্য নাম, এ দেশের প্রান্তিক গণমানুষের হূদয়ে মিশে থাকা এক সংবাদপত্র।

স্বৈরশাসকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে সংবাদপত্রের জগতে মানিক মিয়া যে নির্ভীক ভূমিকা পালন করেছিলেন, তা আজও বিরল উদাহরণ হয়ে আছে। কারণ পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের ওপর নির্যাতন এবং বৈষম্যের প্রকৃত চিত্র যখন ইত্তেফাকের পাতায় অত্যন্ত সাহসের সঙ্গে উঠে আসতে শুরু করল; তখন থেকেই পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী মানিক মিয়াকে থামানোর জন্য নানা ষড়যন্ত্রের নকশা করতে থাকে। একটি সময়ে তারা পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে মানিক মিয়াকে গ্রেফতার করে। পাশাপাশি তার ‘নিউ নেশন প্রেস’ বাজেয়াপ্ত করে দেয়। সেইসঙ্গে আরো দুটি পত্রিকা বন্ধ করে দেয় সরকার। কিন্তু ততোদিনে ইত্তেফাক সাধারণ মানুষের আস্থা লাভ করায় গণআন্দোলনের মুখে সরকার ইত্তেফাকের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হয়। ফলে ১৯৬৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি থেকে পত্রিকাটি আবারো প্রকাশিত হতে শুরু করে।

ইত্তেফাক নামক সংবাদপত্রটি জন্মের পর থেকে ভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, সামরিক শাসন, ছয় দফা আন্দোলন, সাধারণ নির্বাচন এবং ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে এককভাবে জড়িয়ে থেকে হয়ে ওঠে গণমানুষের মুখপত্র। এদেশে কালের পরিবর্তনে বিভিন্ন কাগজ এলেও এ জাতির ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা অর্জনে অনন্য ভূমিকা রাখায় দৈনিক ইত্তেফাককে মানুষ চিরকাল মনে রাখবে। ইত্তেফাক তার সৃষ্টিকাল থেকে বাঙালির রক্তে মিশে থাকা অসাম্প্রদায়িকতাকে ধারণ করে আসছে। তাই স্বাধীনতা পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী সময়েও ইত্তেফাকের স্বকীয়তা বজায় রেখে আজও প্রকাশিত হচ্ছে এবং দেশ ও দশের স্বার্থে জনমনে ইতিবাচক প্রভাব রেখে চলেছে।

 

t লেখক : শিক্ষার্থী, সরকারি বিএল কলেজ, খুলনা