

গাজায় স্থল, আকাশ ও সমুদ্রপথে অভিযানের
প্রস্তুতি ইসরাইলের
Åগাজাকে নরকের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে :জাতিসংঘ Åইসরাইল ও
ইউক্রেনকে একসঙ্গে সহায়তা করার সামর্থ্য যুক্তরাষ্ট্রের আছে :বাইডেন
Åপূর্ব ভূমধ্যসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের আরেক রণতরি, ইরানের হুমকি
g ইত্তেফাক ডেস্ক
গাজায় সর্বাত্মক সেনা হামলার ঘোষণা দিয়েছে ইসরাইল। স্থলপথ, আকাশপথ ও সমুদ্রপথে হামলা চালানোর জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে দেশটির সেনাবাহিনী। উত্তর গাজায় ইসরাইলের সীমানার কাছে বিপুল সংখ্যক সৈন্য জড়ো হয়েছে। উত্তর গাজার কাছে ইসরাইলের বসানো কাঁটাতারের সীমানার ১০ থেকে ১১ কিলোমিটার দূরে আশকেলনে অবস্থান নিয়েছে এই ইসরাইলি সেনারা। সীমান্তে অনেক ট্যাংকও মোতায়েন করা হয়েছে। সেনা অবস্থান ছাড়াও যুদ্ধবিমান আসা যাওয়া ও নজরদারি ড্রোন চলাচলের মতো নানা ঘটনা ঘটছে সেখানে। জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা বলেছে, গাজা দ্রুত ‘জাহান্নামের গর্তে’ পরিণত হচ্ছে। মৃত্যুর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। পানি, বিদ্যুত্ ও তেল সরবরাহ বন্ধ আছে। এখন মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেই গাজা ছাড়তে বলা হচ্ছে। পৃষ্ঠা ৬ কলাম ২
গাজায় স্থল, আকাশ ও সমুদ্রপথে
প্রথম পৃষ্ঠার পর
ভয়ংকর অভিযানের প্রস্তুতি
ইসরাইলের বেশ কিছু যুদ্ধবিমান গাজার দিকে ক্রমাগত যাওয়া-আসা করছে। তবে এই অঞ্চলে বিমানের উপস্থিতি বাড়ানোর কারণ এখনো নিশ্চিতভাবে বোঝা যাচ্ছে না। যদিও শনিবার সারা রাতই গাজা এলাকায় বিমান হামলা হয়েছে। এতে তিন শতাধিক লোক নিহত হয়েছে, যাদের বেশির ভাগ নারী ও শিশু। গতকাল পর্যন্ত গাজায় দুই হাজার ৪৫০ জন নিহত হয়েছে বলে ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে হাসপাতালগুলোর মর্গে লাশ রাখার জায়গা নেই। ফলে বাধ্য হয়ে আইসক্রিমের ফ্রিজারে লাশ রাখতে দেখা গেছে। আর হামাসের হামলায় ইসরাইলে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১ হাজার ৪০০ জনে দাঁড়িয়েছে। ইসরাইল এরই মধ্যে তাদের রিজার্ভে থাকা কয়েক লাখ সৈন্যকে সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুক্ত করেছে। গাজার সীমান্তবর্তী অঞ্চলে অনেক ট্যাংক অবস্থান নিয়েছে বলে বলা হচ্ছে। শনিবার ঐ অঞ্চলে সেনাবাহিনীর কার্যক্রম ও প্রস্তুতি দেখতে যান ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। নেতানিয়াহু মন্তব্য করেছেন যে ‘সংঘাতের পরের পর্ব আসছে।’ এর আগে গত সপ্তাহে হামাসের আকস্মিক হামলার পর তিনি এক ভিডিও বার্তায় হুমকি দিয়েছিলেন যে ইসরাইলি বাহিনী পৃথিবী থেকে হামাসকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলবে।
ইসরাইলি বাহিনী গত দুদিন ধরে গাজায় সর্বাত্মক হামলার হুমকি দিতে থাকলেও কখন এই হামলা শুরু হবে তা এখনো চূড়ান্তভাবে জানায়নি। উত্তর গাজায় হামাস ঘাঁটিতে হামলা করার আগে সেখান থেকে বেসামরিক বাসিন্দাদের সরে যাওয়ার জন্য কয়েক দফায় সময়ও বেঁধে দিয়েছে ইসরাইলি বাহিনী। গাজার উত্তরাঞ্চল থেকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বেসামরিক বাসিন্দাদের দক্ষিণে সরে যেতে শুক্রবার নির্দেশনা দিয়েছিল ইসরাইলি বাহিনী। ঐ সময়সীমা পার হওয়ার পর শনিবার আরো ছয় ঘণ্টা সময় দেওয়া হয় দুটি নির্দিষ্ট রাস্তা ব্যবহার করে উত্তর গাজা থেকে দক্ষিণে সরে যাওয়ার জন্য। এরপর গতকাল রবিবার সকালে আবারো তিন ঘণ্টা সময় বেঁধে দেওয়া হয় বেসামরিক বাসিন্দাদের সরে যাওয়ার জন্য। প্রাথমিকভাবে এই সময়সীমা ছিল স্থানীয় সময় দুপুর একটা (বাংলাদেশ সময় বিকেল ৪টা) পর্যন্ত। তবে সবশেষ খবর পর্যন্ত তারা আরো ৪০ মিনিট বাড়িয়েছে এই সময়সীমা। বেসামরিক বাসিন্দাদের পাশাপাশি এই সময়ের মধ্যে উত্তর গাজার হাসপাতালগুলো খালি করারও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে ইসরাইলি সেনাদের পক্ষ থেকে। কিন্তু ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্ট কমিটি শনিবারই জানিয়ে দেয় যে তারা অসুস্থ ও আহতদের সেবা দিতে থাকায় হাসপাতাল খালি করে যেতে পারবে না।
দাতব্য সেবা সংস্থা মেডিসাঁ সাঁ ফ্রঁতিয়ের নির্বাহী পরিচালক ডা. নাটালি রবার্টস মন্তব্য করেছেন যে কয়েক ঘণ্টার নোটিশে গাজার হাসপাতাল থেকে সরে যাওয়া অসম্ভব। তিনি বলছেন, তাদের যাওয়ার কোনো জায়গাই নেই। গাজার দক্ষিণের হাসপাতালগুলো সম্পূর্ণ ভরে গেছে। তাছাড়া পুরো গাজাতেই এখন কোনো বিদ্যুত্ নেই। এছাড়াও দক্ষিণ গাজার হাসপাতালগুলোতে রোগীদের স্থান সংকুলান করাও কঠিন হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন তিনি। হাসপাতাল খালি করার নির্দেশনাকে রোগীদের জন্য মৃত্যুদণ্ডের শামিল হিসেবে মন্তব্য করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত শনিবার ইসরাইলি বাহিনীর অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে গাজায় ২৮ জন চিকিত্সা সেবাদানকারী মারা গেছেন। তারা আরো জানিয়েছে যে, গাজার দুটি হাসপাতালে কোনো সেবা দেওয়া যাচ্ছে না এবং ১৫টি মেডিক্যাল সেন্টার ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এদিকে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে গঠন করা জাতীয় ঐক্য সরকারের জরুরি মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠক করেছেন। ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকার সঙ্গে রাফাহ সীমান্ত ক্রসিংয়ে সামরিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে মিসর। দেশটি আশঙ্কা করছে, গাজার লাখো ফিলিস্তিনি শরণার্থীকে সিনাই মরুভূমিতে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে ইসরাইল। যদিও মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিনকেন জানিয়েছেন, রাফাহ ক্রসিং খোলা থাকবে।
যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি রণতরি, ইরানের হুমকি
যুক্তরাষ্ট্র পূর্ব ভূমধ্যসাগরে যুদ্ধবিমান বহনকারী আরেকটি রণতরি-ইউএসএস আইজেনহাওয়ার পাঠিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী লয়েড অস্টিন শনিবার জানান যে, ইসরাইলের বিরুদ্ধে আগ্রাসি হামলা স্তিমিত করতে ও হামাসের হামলাকে ঘিরে ঐ অঞ্চলে যুদ্ধের বিস্তার থামাতে এই রণতরি পাঠানো হয়েছে। গত সপ্তাহে হামাস ও ইসরাইলি বাহিনীর এই সংঘাত শুরু হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র পূর্ব ভূমধ্যসাগরে একটি রণতরী পাঠায়। নতুন পাঠানো রণতরী ইউএসএস আইজেনহাওয়ার আগে থেকে অবস্থান করা রণতরী ইউএসএস ফোর্ডের সঙ্গে যোগ দেবে। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে আরো যুদ্ধবিমান পাঠিয়েছে ওয়াশিংটন। অন্যদিকে গাজায় বেসামরিক বাসিন্দাদের ওপর ইসরাইলের অভিযান অব্যাহত থাকলে ঐ অঞ্চলের পরিস্থিতি একরকম থাকার নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারবে না বলে সতর্ক করেছে ইরান। হামাসের লক্ষ্য অর্জনে ইরান সহায়তা করবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
ইসরাইল ও ইউক্রেনকে সহায়তা দেবে যুক্তরাষ্ট্র
প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন সিবিএস নিউজকে দেওয়া সাক্ষাত্কারে জানিয়েছেন, ইসরাইল এবং ইউক্রেনকে সহায়তা দেওয়া অব্যাহত রাখবে যুক্তরাষ্ট্র। তিনি বলেন, এই সামর্থ্য তার দেশের রয়েছে। বাইডেন বলেন, দুই দেশকে সহায়তা করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে ওয়াশিংটনের। একসঙ্গে দুই দেশকে সামরিক সহায়তা দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে সম্ভব কিনা সেই প্রশ্নের জবাবে প্রেসিডেন্ট বাইডেন বলে, বিশ্বে নয়, বিশ্বের ইতিহাসে যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র। সেদিক বিবেচনা করে আমরা দুই দেশকেই সহায়তা দিতে পারবো। বাইডেন বরং প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন, আমরা যদি না পারি তাহলে বিশ্বে পারবেটা কে?
গাজায় ইসরাইলের আক্রমণে যেন বেসামরিক বাসিন্দারা হতাহত না হয়, সে বিষয়ে জোর দিয়ে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে শনিবার ফোনে আলোচনা করেন প্রেসিডেন্ট বাইডেন। গাজায় বেসামরিক বাসিন্দাদের জন্য ত্রাণ ও জরুরি সেবা নিশ্চিত করার বিষয়ে বাইডেন প্যালেস্টিনিয়ান লিবারেশন অরগানাইজেশন, পিএলওর নেতা মাহমুদ আব্বাসের সঙ্গেও ফোনে কথা বলেন। ফিলিস্তিন প্রেসিডেন্টকে সে দেশের বাসিন্দাদের জন্য জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় যে কোনো সাহায্যের আশ্বাস দিয়েছেন বাইডেন। এদিকে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে বৈঠক ‘খুবই ফলপ্রসূ’ হয়েছে বলে দাবি করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিনকেন। এদিকে মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, ব্লিনকেন গাজায় চালানো ইসরাইলের সামরিক অভিযান সমর্থন করেছেন। তবে এই সংঘাতে বেসামরিক হতাহতের ঘটনা এড়ানোর অনুরোধ জানিয়েছেন। ব্লিনকেন আজ সোমবার আবার ইসরাইল সফরে যেতে পারেন।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জ্যাক সুলিভান সতর্ক করেছে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের তীব্রতা বৃদ্ধির ঝুঁকি রয়েছে। সুলিভান জানিয়েছেন, ইসরাইল ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকার দক্ষিণাঞ্চলে পানি ছেড়েছে। ইসরাইলি কর্মকর্তারা তাকে অবহিত করেছেন যে গাজার দক্ষিণাঞ্চলের পানির পাইপগুলো আবার সচল করা হয়েছে। ইসরাইলের মার্কিন দূতাবাস যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক ও তাদের আত্মীয়দের সাগরপথে ইসরাইল ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে। উত্তর ইসরাইলের হাইফা বন্দর থেকে সাগরপথে সাইপ্রাস যাওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে সেখানকার মার্কিন নাগরিকদের। —বিবিসি, রয়টার্স ও সিএনএন