হেপাটাইটিস সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণা ও চিকিত্সা

ড. ঝুমুর ঘোষ

বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ২০ হাজারের বেশি মানুষ হেপাটাইটিসের কারণে মৃত্যুবরণ করে থাকে। হেপাটাইটিস সম্পর্কে অধিকাংশ মানুষের মধ্যে প্রচলিত অনেক ভুল ধারণা আছে। বেশির ভাগ মানুষ মনে করে, হেপাটাইটিস মানেই জন্ডিস। প্রকৃত অর্থে হেপাটাইটিস হলো লিভারের প্রদাহ এবং জন্ডিস হলো লিভারের প্রদাহের একটি উপসর্গ অথবা লক্ষণ। হেপাটাইটিসে আক্রান্ত ব্যক্তির জন্ডিস থাকতে পারে আবার নাও থাকতে পারে। জন্ডিস হলে আক্রান্ত ব্যক্তির চোখ, প্রস্রাব এবং শরীরের ত্বক হলুদ বর্ণের হয়ে থাকে। হেপাটাইটিসের অন্য উপসর্গগুলো হলো ক্ষুধামন্দা, অবসাদ, বমিভাব, মাংসপেশিতে ব্যথা ইত্যাদি। হেপাটাইটিস যদি ছয় মাসের মধ্যে ভালো হয়ে যায় তাকে একিউট বা স্বল্পমেয়াদি হেপাটাইটিস বলে। ছয় মাসের বেশি স্থায়ী হলে তাকে ক্রনিক বা দীর্ঘমেয়াদি হেপাটাইটিস বলে। একিউট হেপাটাইটিস বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভালো হয়ে যায়। ক্রনিক হেপাটাইটিসে আক্রান্ত ব্যক্তির বিভিন্ন ধরনের জটিলতা যেমন—লিভার সিরোসিস, লিভার ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

হেপাটাইটিস বিভিন্ন কারণে হতে পারে, যেমন—ভাইরাল হেপাটাইটিস, অতিরিক্ত শারীরিক ওজন, অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার গ্রহণ, নির্দিষ্ট ওষুধ সেবন, অতিরিক্ত মদ্যপান, শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার পরিবর্তন, বংশগত কারণ ইত্যাদি। এসব কারণের মধ্যে ভাইরাল হেপাটাইটিস অন্যতম প্রধান একটি কারণ। পাঁচ ধরনের ভাইরাস (হেপাটাইটিস—এ, বি, সি, ডি ও ই) দ্বারা লিভারের সংক্রমণ হয়ে থাকে। হেপাটাইটিস এ ও ই ভাইরাস দূষিত খাবার ও পানির মাধ্যমে ছড়িয়ে থাকে। হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাস মূলত রক্তের মাধ্যমে ছড়ায়। এছাড়া অনিরাপদ শারীরিক সম্পর্ক, অস্ত্রোপচার, দাঁতের চিকিত্সা ও ডায়ালাইসিসের মাধ্যমে বি ও সি ভাইরাস ছড়াতে পারে। গর্ভাবস্থায় মা যদি হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাসে আক্রান্ত থাকে তাহলে শিশুও আক্রান্ত হতে পারে। হেপাটাইটিস ডি কেবল হেপাটাইটিস বি দ্বারা আক্রান্ত ব্যক্তিদেরই সংক্রমণ করতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি মানুষ হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাসে আক্রান্ত। অনেক মানুষ মনে করেন ভাইরাল হেপাটাইটিস একটি ছোঁয়াচে রোগ। সত্যিটা হলো হেপাটাইটিসে আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশি, হাতের স্পর্শ ও একই থালাবাসনে খাওয়া-দাওয়ার মাধ্যমে এই ভাইরাস ছড়ায় না। ভাইরাল হেপাটাইটিসে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে প্রতি ১০ জনের ৯ জনই জানেন না যে তারা হেপাটাইটিসে আক্রান্ত। বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫ শতাংশ মানুষ হেপাটাইটিস বি এবং প্রায় ১ শতাংশ হেপাটাইটিস সি ভাইরাসে আক্রান্ত। লিভার ক্যানসারের প্রায় ৮০ ভাগ হচ্ছে এই দুই ভাইরাসের কারণে।

হেপাটাইটিসের উপসর্গ দেখা দিলে অনেক মানুষ চিকিত্সকের পরামর্শ না নিয়ে বিভিন্ন কবিরাজি পদ্ধতি যেমন—ঝাড়ফুঁক, ডাবপড়া, পানিপড়া, লেবুপড়া, তাবিজ, মালা পরানো এসবের দ্বারস্থ হন। সবচেয়ে মারাত্মক হলো কিছু রোগী গরম পয়সা এবং লোহার ছ্যাঁকের পদ্ধতি নিয়ে থাকেন। তারা বিশ্বাস করেন এসব পদ্ধতির মাধ্যমে তাদের লিভারের রোগ সেরে যাবে। তবে এসব পদ্ধতির কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। যেহেতু হেপাটাইটিস এ ও ই ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তি সম্পূর্ণ বিশ্রামে থেকে তিন থেকে ছয় সপ্তাহের মধ্যে এমনিতেই সুস্থ হয়ে যান, কবিরাজ এটাকেই তার চিকিত্সার সাফল্য হিসেবে দাবি করেন। অনেক রোগী কবিরাজি পদ্ধতির জন্য সময় নষ্ট করে দীর্ঘমেয়াদি হেপাটাইটিসজনিত জটিলতা যেমন—পেটে পানি, রক্তবমি, লিভারের ক্যানসার ইত্যাদি উপসর্গ নিয়ে শেষ পর্যায়ে চিকিত্সকের কাছে আসেন। তখন চিকিত্সক শেষ পর্যায়ের চিকিত্সা দেওয়া ব্যতীত তেমন কিছু করতে পারেন না। সঠিক সময়ে হেপাটাইটিসের কারণ নির্ণয় করতে পারলে উপযুক্ত চিকিত্সার মাধ্যমে রোগটি বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নিরাময় করা সম্ভব। তাই হেপাটাইটিসের কোনো উপসর্গ অথবা লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত লিভার বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।

প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপসমূহ ও চিকিত্সা

১. ভাইরাল হেপাটাইটিস : হেপাটাইটিস এ ও ই দূষিত খাবার ও পানির মাধ্যমে ছড়ায়, তাই বাইরের খোলা খাবার ও পানি পান পরিহার করতে হবে। হেপাটাইটিস বি, সি ও ডি প্রতিরোধ করার জন্য জীবাণুমুক্ত রক্ত ও রক্তের উপাদান, সুঁই ও সিরিঞ্জ ব্যবহার করতে হবে।

হেপাটাইটিস এ ও বি প্রতিরোধের কার্যকরী টিকা আছে। হেপাটাইটিস বি-এর টিকার মাধ্যমে হেপাটাইটিস ডি ভাইরাসও প্রতিরোধ করা সম্ভব, চিকিত্সকের পরামর্শ অনুযায়ী সবাইকে এ ও বি ভাইরাসের টিকা নিতে হবে।

গর্ভবতী মায়েদের হেপাটাইটিস আছে কি না পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হতে হবে। মা হেপাটাইটিস বি-তে আক্রান্ত থাকলে নবজাতককে জন্মের ১২ ঘণ্টার মধ্যে চিকিত্সকের পরামর্শক্রমে টিকা দিতে হবে। গর্ভবতী মা গর্ভাবস্থায় হেপাটাইটিস বি-এর চিকিত্সা নিতে পারবে কিন্তু হেপাটাইটিস সি ভাইরাসে আক্রান্ত মাকে সন্তান জন্মের পর চিকিত্সা গ্রহণ করতে হবে। গর্ভবতী মা হেপাটাইটিস এ ও ই ভাইরাসে আক্রান্ত হলে একিউট লিভার ফেইল্যুরের ঝুঁকি ২০ শতাংশ, তাই গর্ভাবস্থায় বাইরের খোলা খাবার বর্জন করতে হবে এবং চিকিত্সকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিত্সা গ্রহণ করতে হবে।

ভাইরাল হেপাটাইটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিকে সামাজিক বৈষম্য ও কুসংস্কার থেকে মুক্ত করতে হবে। হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তি রক্ত ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দান করতে পারবেন না। 

চিকিত্সকের পরামর্শ অনুযায়ী হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাসের ওষুধ খেতে হবে। প্রাথমিক পর্যায়ে বি ও সি ভাইরাল হেপাটাইটিসের চিকিত্সা নিলে লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যানসারের ঝুঁকি অনেক কমে যাবে।

২. লিভারের চর্বিজনিত হেপাটাইটিস : অতিরিক্ত শর্করা ও চর্বিযুক্ত খাবার পরিহার করতে হবে। সবুজ শাকসবজি ও ফলমূল প্রতিদিন খাবারের তালিকায় রাখতে হবে। অতিরিক্ত পিত্জা, বার্গার জাতীয় ফাস্ট ফুড ও প্রসেসড ফুড খাওয়া বর্জন করতে হবে। নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে। দৈনিক ৩০ মিনিট হাঁটতে হবে। শারীরিক ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।

ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হাইপোথাইরয়েডিজম ও রক্তের চর্বির চিকিত্সা অবশ্যই নিতে হবে। অতিরিক্ত মদ্যপান পরিহার করতে হবে। চিকিত্সকের পরামর্শ অনুযায়ী লিভারের চর্বি কমানোর ওষুধ ও অন্যান্য রোগের ওষুধ সেবন করতে হবে।

৩. হেপাটাইটিসের অন্যান্য কারণ : রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার পরিবর্তন (অটোইমিউন হেপাটাইটিস) ও বংশগত কারণজনিত হেপাটাইটিস (উইলসন্স ডিজিজ, হিমোক্রোমাটোসিস) নির্ণয় করার জন্য লিভার বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে। রোগ নির্ণয় হলে ওষুধ সেবন করতে হবে। পরিবারের অন্য সদস্যদের মধ্যে বংশগত লিভারের রোগ আছে কি না পরীক্ষা করাতে হবে।

n লেখক :চিকিত্সক